সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহান গত বুধবার জাতীয় উন্নয়ন সম্মেলনে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম সম্পদ হলো বিদেশে বসবাসরত বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই মানবসম্পদকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না হলে বর্তমান প্রবৃদ্ধি মডেল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেবে। সোবহানের এই বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে ও বৈদেশিক নীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে, বিশেষত যখন দেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি‑ভিত্তিক মডেল ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে। তার মন্তব্য তৎক্ষণাৎ মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং নীতি নির্ধারকদের মধ্যে তীব্র আলোচনার সূচনা করে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মী সংখ্যা বর্তমানে ১.৫ কোটি অতিক্রম করেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশ ভাগেরও বেশি। ঐতিহাসিকভাবে, এই কর্মীরা রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের মুদ্রা সঞ্চয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; তবে রেমিট্যান্সের ব্যবহার মূলত ভোগ্যপণ্যের ক্রয় ও পরিবারের মেরামতে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সরকার পূর্বে ‘ডায়াস্পোরা নীতি’ প্রণয়ন করলেও তা সীমিত কার্যকারিতা দেখিয়েছে। একইসঙ্গে, দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্রচলিত রপ্তানি‑কেন্দ্রিক ও শ্রম‑নির্ভর মডেলকে অপ্রতুল বলে বিবেচনা করে নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের দাবি বাড়ছে। এই পটভূমিতে সোবহানের মন্তব্য একটি নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে, যেখানে মানবসম্পদকে জ্ঞান‑ভিত্তিক, প্রযুক্তি‑নির্ভর ও উদ্যোক্তা‑মুখী প্রকল্পে যুক্ত করা হবে।
সোবহানের বক্তব্যের পর সরকারী প্রতিনিধিরা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং তরুণ উদ্যোক্তা গোষ্ঠী দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, সরকার ইতিমধ্যে ‘ডায়াস্পোরা ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ গঠন করে বিদেশি বাংলাদেশিদের বিনিয়োগকে সহজতর করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, যুব মঞ্চের প্রতিনিধিরা জোর দেন, রেমিট্যান্সের ব্যবহারকে উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তরিত করা জরুরি, যাতে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি সংস্থাগুলিও সোবহানের আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে, দেশীয় স্টার্ট‑আপে প্রযুক্তি ও পুঁজি সরবরাহের জন্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। এসব মন্তব্য একত্রে দেশের নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত দেয় যে, ডায়াস্পোরা সম্পদকে কেবল রেমিট্যান্সের মাধ্যমে নয়, বরং জ্ঞান‑সংশ্লিষ্ট সেবা, গবেষণা ও উদ্ভাবনী প্রকল্পে যুক্ত করা দরকার।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ইতিমধ্যে ‘ডায়াস্পোরা সংযোগ কেন্দ্র’ স্থাপন, বিদেশি বাংলাদেশিদের জন্য একক যোগাযোগ সেবা ও বিনিয়োগের সুবিধা প্রদান, এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ কর্মী আহ্বান করার জন্য বিশেষ ভিসা স্কিম চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ২০২৫-এ ডায়াস্পোরা সম্পদকে মোট জিডিপির ৩% পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলি বাস্তবায়িত হলে, প্রচলিত রপ্তানি‑কেন্দ্রিক মডেল থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে, জ্ঞান‑ভিত্তিক ও উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে রূপান্তর সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এভাবে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ দূর করে, দেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব হবে।