সকাল ৯টায় গৃহশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্থ এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নুর আজম (বয়স ৫৬) সময়মতো উপস্থিত হন। শিক্ষক দিবসের উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে সাজিয়ে রাখা টেবিলে ফুলের গুচ্ছ তুলে হাতে দিল। নুর আজম উষ্ণ হাসি দিয়ে ফুল গ্রহণের পর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানিয়ে হাত নাড়লেন। তবে আনন্দের মুহূর্তের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিক্ষকটি হঠাৎ শ্বাসকষ্টে চেঁচিয়ে উঠলেন এবং বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে ধসে পড়ে অচেতন অবস্থায় রইলেন। উপস্থিত চিকিৎসক ও কর্মীরা তৎক্ষণাৎ প্রাথমিক সি.পি.আর. প্রদান করলেও, কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই আকস্মিক ঘটনার ফলে পুরো বিদ্যালয় ও আশেপাশের সম্প্রদায় শোকাহত হয়ে পড়ে।
নুর আজম শিক্ষক ৩২ বছর আগে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে যোগদান করেন এবং তার পর থেকে তিনি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও একাডেমিক উৎকর্ষের প্রতি অটল দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কর্মজীবনে বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করে তিনি শিক্ষকমণ্ডলীর মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষক দিবসের এই অনুষ্ঠানটি প্রতি বছর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একত্রে উদযাপন করে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে সম্মান জানাতে ফুল, স্নেহের চিঠি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করে। নুর আজমের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা রিপোর্টে কোনো গুরুতর রোগের উল্লেখ না থাকলেও, তার বয়স ও দীর্ঘদিনের কাজের চাপকে বিবেচনা করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজনীয় ছিল।
ঘটনার পরপরই নুর আজমের পরিবার, বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং স্থানীয় শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শোক প্রকাশের পাশাপাশি মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। নুর আজমের স্ত্রী রেহানা জানান, “আমার স্বামী সবসময় শিক্ষার্থীদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে ছিলেন; তার এই আকস্মিক মৃত্যু আমাদের জন্য অমীমাংসিত শোক।” বিদ্যালয়ের উপ-প্রধান মেজর আহমেদ বলেন, “শিক্ষকবৃন্দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব; এই দুঃখজনক ঘটনা আমাদেরকে পুনরায় সতর্ক করে।” শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাব্বি হক উল্লেখ করেন, “শিক্ষকবৃন্দের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে।” সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ও অভিভাবকরা নুর আজমের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে শোকের বার্তা ও ফুলের ছবি শেয়ার করে, যা ব্যাপক সমবেদনা সৃষ্টি করে।
শিক্ষা অধিদপ্তর ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে, যা শিক্ষকের স্বাস্থ্য রেকর্ড, বিদ্যালয়ের জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করবে। তদুপরি, সকল সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জরুরি সি.পি.আর. প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে। বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শিক্ষকের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য কাউন্সেলিং সেবা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করা হবে। সরকারী পর্যায়ে শিক্ষক কল্যাণ আইন সংশোধনের প্রস্তাবও বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষকদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা, জরুরি অবসর সুবিধা এবং কর্মস্থল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এই পদক্ষেপগুলো নুর আজমের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি উন্নত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।