গত সপ্তাহে ঢাকা শহরের প্রধান দৈনিকের সম্পাদকীয় বোর্ড একটি ঐক্যবদ্ধ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবের সঙ্গে বিরোধী দলকে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এই প্রস্তাবটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কার, মৌলিক অধিকার ও সংবিধানিক কাঠামোর আধুনিকীকরণকে লক্ষ্য করে, এবং তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা, বিচারিক স্বায়ত্তশাসন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা জাগায়। প্রকাশনা সংস্থা উল্লেখ করে, বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আইনগত অমিলের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের সমন্বিত উদ্যোগ দেশের সংবিধানিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য।
সংবিধান সংশোধনের আলোচনার শিকড় ১৯৯১ সালের মৌলিক আইন থেকে শুরু হয়, যখন প্রথমবারের মতো বহুমুখী রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধানিক কাঠামোকে জনগণের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি উত্থাপন করে। তবে পরবর্তী দুই দশকে ধারাবাহিকভাবে সরকার-বিরোধী পারস্পরিক অবিশ্বাস, নির্বাচনী মন্দা ও বিচারিক ব্যাখ্যার ভিন্নতা সংশোধনের প্রস্তাবকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ২০২২ সালে নির্বাচনের পর গৃহীত বেশ কিছু আইন—যেমন তথ্য স্বচ্ছতা আইন ও নির্বাচন সংস্কার বিল—সংবিধানিক কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে, ফলে সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্পাদকীয় বোর্ডের সমন্বিত আহ্বানটি ঐতিহাসিকভাবে প্রথমবারের মতো বিরোধী দলকে সরাসরি সংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্পাদকীয় বোর্ডের প্রধান সম্পাদক আহমেদুল হক বলেন, ‘সংবিধানকে সকল রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত স্বার্থের প্রতিফলন করতে হবে; অন্যথায় তা সমাজের বিভাজনকে বাড়িয়ে তুলবে।’ বিরোধী দলীয় নেতা জহিরুল ইসলামও এই আহ্বানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘বিপক্ষের সঙ্গে মিলে সংবিধানিক সংস্কার করা হলে ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হবে।’ তবে কিছু বিশ্লেষক ও নাগরিক সংগঠন এই প্রস্তাবকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সমালোচনা করে, তারা যুক্তি দেন যে সংবিধানিক পরিবর্তনকে রাজনৈতিক লেনদেনের হাতিয়ার বানানো হলে তা জনসাধারণের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করবে। সামাজিক মাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়, যেখানে তরুণ ভোটাররা অধিক স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের দাবি তুলে ধরছে।
সরকারি পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তবে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংবিধানিক সংস্কার কমিটি দ্রুত একটি বিশেষ সভা আহ্বান করার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। কমিটি সদস্যদের মধ্যে আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করা যায়। যদি এই প্রস্তাবটি সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয়, তবে তা সংশোধনী প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ—সংশোধনী বিলের প্রস্তাবনা—সংশ্লিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেতে হবে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় পার্টি-সীমা অতিক্রম করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সমন্বিত নীতি গঠন করা সম্ভব হবে, যা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক সুনামকে শক্তিশালী করবে।