সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে বিনোদন পার্কে রূপান্তর করার পরিকল্পনা প্রকাশ পায়, যা দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ বলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট বনভূমি ১,২০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিরল প্রজাতির গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, যা জাতীয় পরিবেশ সংরক্ষণ পরিকল্পনার অধীনে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্কে রোলার কোস্টার, থিমেড রেস্টুরেন্ট এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করা হবে, ফলে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ সমিতি, নাগরিক সংগঠন এবং বিজ্ঞানী গোষ্ঠী তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করে, দাবি করে যে উন্নয়নকে পরিবেশের ক্ষতি না করে টেকসই পদ্ধতিতে করা উচিত।
বনাঞ্চলটি ১৯৯৫ সালে সরকারী আদেশে সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয়, এবং পরবর্তী বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ সংস্থার স্বীকৃতি পায়। ঐ অঞ্চলে ৩৫০ টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতি এবং ১২০ টিরও বেশি পাখি, স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপের প্রজাতি বাস করে, যেগুলোই দেশের জৈববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতীতে একই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইইএ) যথাযথভাবে না করা হলে প্রকল্প স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। তবে এইবার সরকার ইইএ প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি অনুমোদন প্রদান করেছে বলে সমালোচকরা অভিযোগ তুলেছেন, যা পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি ও আইনি কাঠামোর প্রতি অবহেলা নির্দেশ করে।
পরিবেশ সংরক্ষণ সমিতির সভাপতি ড. রুবি আহমেদ বলেন, “বনকে বিনোদন পার্কে রূপান্তর করা মানে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান ধ্বংস করা, যা দীর্ঘমেয়াদে ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট করবে।” স্থানীয় কৃষক ও গ্রামবাসীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে, কারণ বনভূমি থেকে পানির সরবরাহ ও মাটির উর্বরতা তাদের জীবিকার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উল্লেখ করেন, “এই প্রকল্পটি আঞ্চলিক পর্যটন উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে করা হচ্ছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।” তবে উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি, ফলে জনমত বিভক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে।
এই বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ একত্রে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে, যা প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করবে। পাশাপাশি, উচ্চ আদালতে পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থাগুলি মামলা দায়ের করেছে, যাতে প্রকল্পের অনুমোদন বাতিলের দাবি করা হয়। সরকারও জানিয়েছে, যদি পুনর্মূল্যায়নের ফলাফল প্রকল্পকে হুমকির মুখে ফেলে, তবে বিকল্প স্থানে টেকসই পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় জনসাধারণের মতামত সংগ্রহ, পরিবেশগত নীতি মেনে চলা এবং টেকসই উন্নয়নের নীতি অনুসরণ করা হবে, যাতে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ দুটোই সমন্বিতভাবে এগিয়ে যায়।