মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে দর্শনার্থীদের নৌকাভ্রমণের সুবিধা প্রদানকারী একটি প্রকল্প সাম্প্রতিক সময়ে অনুমোদিত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী হ্রদের উপর ছোট নৌকা চালিয়ে পর্যটকদের প্রাণী পর্যবেক্ষণ ও প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের সুযোগ তৈরি করা হবে। তবে এই উদ্যোগটি চিড়িয়াখানার মূল কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে; হ্রদের তীরবর্তী বাসস্থান, পাখির প্রজনন ক্ষেত্র এবং কিছু সংবেদনশীল প্রজাতির আশ্রয়স্থলকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রকল্পটি অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণী কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে তীব্র বিতর্কের জন্ম নিয়েছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানা ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের বৃহত্তম প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। হ্রদটি মূলত ম্যানগো এবং জলজ উদ্ভিদ সমৃদ্ধ একটি ইকোসিস্টেম, যা বহু পাখি প্রজাতি ও জলজ প্রাণীর প্রজননস্থল। পূর্বে চিড়িয়াখানার ব্যবস্থাপনা দল হ্রদের পরিবেশগত গুরুত্ব তুলে ধরে, পর্যটন বৃদ্ধির জন্য স্থলভিত্তিক পথ ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণের সুপারিশ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটন আয় বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগের প্রস্তাব উঠে আসে, যার মধ্যে নৌকাভ্রমণ প্রকল্পটি অন্যতম। এই প্রস্তাবের পেছনে স্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও মিডিয়া প্রচার প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
প্রকল্পের ঘোষণার পর চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. রশিদ হক উল্লেখ করেন, নৌকাভ্রমণ থেকে প্রাপ্ত টিকিট আয়কে প্রাণী চিকিৎসা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা 'সবুজ বাংলাদেশ'ের সভাপতি শ্রীমতি নূরজাহান বললেন, হ্রদের জলে নৌকা চালানো জলমানের পরিবর্তন, শব্দ দূষণ এবং প্রাণীর আচরণে ব্যাঘাত ঘটাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। সাধারণ দর্শনার্থীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে, কিছু পরিবার শিশুদের সঙ্গে নিরাপদে হ্রদে নৌকা চালানোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সামাজিক মিডিয়ায় এই বিষয়টি নিয়ে বিশাল আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সমর্থকরা পর্যটন উন্নয়নকে স্বাগত জানায় এবং বিরোধীরা পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি তুলে ধরে।
প্রতিক্রিয়ার পর সরকারী দপ্তর অবিলম্বে প্রকল্পের অগ্রগতি স্থগিত করার নির্দেশ জারি করেছে এবং বিষয়টি নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটিতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হ্রদের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে, বিকল্প পর্যটন মডেল প্রস্তাব করবে এবং চিড়িয়াখানার দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ নীতি পুনর্বিবেচনা করবে। পাশাপাশি, চিড়িয়াখানার পরিচালনা পরিষদকে প্রকল্পের আর্থিক হিসাব ও সামাজিক প্রভাবের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে নৌকাভ্রমণ অনুমোদন পেতে হলে কঠোর পরিবেশগত শর্তাবলী মেনে চলা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমর্থন নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে কর্তৃপক্ষের মন্তব্য।