মোঃ খাইরুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনে-রাতে মিলিয়ে গড়ে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কালিয়াকৈরের বিভিন্ন গ্রাম, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে নিয়মিত দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কখনো টানা কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার পরও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না। ফলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে মৌচাক, তেলিরচালা ও চন্দ্রা এলাকার হরতকিতলা, আমতলা, মাইওয়ান মোড়সহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানায় বিদ্যুতের চাহিদা ১২০ মেগাওয়াটের বেশি। তবে জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় বর্তমানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কালিয়াকৈর পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাসপাতালেও চরম ভোগান্তি
শুক্রবার সকালে কালিয়াকৈর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাঁদের স্বজনরা তীব্র গরমে হাতপাখা ও ফাইল দিয়ে বাতাস করছেন। হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সাদিয়া তানসিম আক্তার মুনমুন জানান, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশন, রোগীদের নেবুলাইজার, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষা কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে জেনারেটরও প্রয়োজন অনুযায়ী দীর্ঘ সময় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মৌচাক ও চন্দ্রার হরতকিতলা এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বিজিএমইএ নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
কৃষি ও পানি সরবরাহেও সংকট
বিদ্যুৎ না থাকায় গভীর নলকূপ ও সেচ পাম্প চালাতে না পারায় আমন চাষিরাও বিপাকে পড়েছেন। পাশাপাশি বাসাবাড়িতে পানির পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির সংকট। এ ছাড়া বিদ্যুৎ না থাকায় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কম্পিউটার ল্যাব ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। রাতের বেলায় সড়ক ও বিভিন্ন এলাকা অন্ধকার থাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
দ্রুত সমাধানের দাবি
দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের এমন চরম সংকটে অতিষ্ঠ হয়ে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে কালিয়াকৈর উপজেলা নাগরিক কমিটি ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চল ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সমস্যার সমাধান না হলে কঠোর আন্দোলন ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।