মোঃ খাইরুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন বাজার ও অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফার্মেসি। অভিযোগ রয়েছে, এসব ফার্মেসির একটি বড় অংশে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, কসমেটিকস এবং প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, সফিপুর, মৌচাক, কালিয়াকৈর বাজার, হরিণহাটি, সিনাবহসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পাশাপাশি একাধিক ফার্মেসি রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই।
এদিকে বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) কালিয়াকৈরের সফিপুর বাজারে অভিযান চালিয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও কসমেটিকস সংরক্ষণ এবং লাইসেন্স নবায়ন না থাকার অভিযোগে রোজা মেডিসিন কর্নার ও সাগরিকা ফার্মেসিকে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামসুন নাহার শিলা। অভিযানকালে রোজা মেডিসিন কর্নারে বিভিন্ন ধরনের মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস্ট্রিক, জ্বর ও ব্যথার ওষুধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাগরিকা ফার্মেসির ফ্রিজে সংরক্ষিত ইনসুলিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের মেয়াদও উত্তীর্ণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামসুন নাহার শিলা সাংবাদিকদের বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানুষের জীবন নিয়ে খেলার শামিল। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। কালিয়াকৈরের কোনো ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল বা ভেজাল ওষুধ পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, কিছু ফার্মেসিতে ড্রাগ লাইসেন্স ও প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা, প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ও ঘুমের ওষুধ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিটি বাজার ও অলিগলিতে অভিযান চালানো হবে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাধারণ মানুষকে ওষুধ কেনার আগে মেয়াদ যাচাই করার পাশাপাশি বিক্রির ভাউচার নেওয়ার এবং কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে উপজেলা প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, কালিয়াকৈর উপজেলায় বিপুলসংখ্যক ফার্মেসি থাকলেও এর মধ্যে তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান ভুয়া লাইসেন্স বা লাইসেন্সের ফটোকপি ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করছে। আবার কোথাও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়াই কর্মচারীদের দিয়ে ওষুধ বিক্রি ও রোগীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফার্মেসি কর্মচারী অভিযোগ করেন, তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট না থাকায় অনেক সময় তাকেই রোগীদের ওষুধ দিতে হয়। তার দাবি, কিছু ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের গায়ে নতুন স্টিকার লাগিয়ে বিক্রির নির্দেশও দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কালিয়াকৈর একটি শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিক ও সাধারণ মানুষের বসবাস। স্থানীয়দের ভাষ্য, অসুস্থ হলে অনেক শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষ দ্রুত চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে থাকেন। ফলে অননুমোদিতভাবে ওষুধ বিক্রি কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহের ঘটনা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সফিপুর এলাকার এক পোশাকশ্রমিক রিনা বেগম অভিযোগ করে বলেন, সন্তানের জ্বরের জন্য একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার পর শিশুর বমি শুরু হয়। পরে ওষুধের প্যাকেট দেখে তিনি জানতে পারেন, সেটির মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে গেছে। সচেতন মহলের দাবি, শুধু জরিমানা আদায় করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব ফার্মেসির বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ঔষধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা। সুরক্ষায় কালিয়াকৈরের প্রতিটি ফার্মেসির লাইসেন্স, প্রশিক্ষিত জনবল, ওষুধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং মেয়াদ নিয়মিত যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।